Home » শিক্ষা » নির্দয় কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড, ছাড় দেয়নি ১ নম্বরও

নির্দয় কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড, ছাড় দেয়নি ১ নম্বরও

Share Button

SSC Result Students Crying

নাজমুল আলম অর্নব, কুমিল্লা জিলা স্কুলের বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সব বিষয়ে  জিপিএ-৫ পেলেও রসায়নে সে ফেল করেছে। ইন্টারনেট থেকে ফলাফল বিবরণী নিয়ে দেখা গেলো, সে রসায়ণে ৫৭ নম্বর পেয়েছে। এর মধ্যে নৈর্ব্যক্তিকে ২৩, ব্যবহারিকে ২৫ নম্বর পেলেও লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ৯ পেয়েছে। অথচ লিখিত পরীক্ষায় এটি তার কাঙ্খিত ফল নয়। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক রাশেদা আখতারও এই ফল মানতে নারাজ। একই অবস্থা ঐ স্কুলের মেধাবী ছাত্র আমিনুর রশিদ রাফির। সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেলেও রসায়নে সে ৫৭ নম্বর পেয়ে ফেল করেছে। অপরদিকে ব্রাহ্মণপাড়ার মালাপাড়া বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের কামরুল হাসান কৃষি শিক্ষায় ৭২ নম্বর পেয়েও ফেল করেছে। এই ৭২ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৪০, ব্যবহারিকে ২৫ এবং নৈব্যত্তিকে ৭ পেয়েছে। অথচ নৈর্ব্যক্তিকে ১ নম্বর সহায়ক নম্বর পেলে ঐ বিষয়ে পাশ করতো জিপিএ-৫ এর একটু কম নম্বর পেয়ে। এ রকম ১ বা ২ নম্বরের জন্য কুমিল্লা বোর্ডের অনেক পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। খাতা মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে চরম কড়াকড়ি, কোন কোন পরীক্ষকের ভুলের পাশাপাশি  ১ নম্বরও অনুকম্পা না দেখানোয় কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ দিকে পরীক্ষকরা উত্তরপত্র ত্রুটিমুক্তভাবে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে যথাযথভাবে করেন নি বলে অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের। তারা বলছেন,  ১ বা ২ নম্বরের জন্য কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের নির্দয় আচরণের ফলে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ। তাছাড়া প্রাপ্ত নম্বরের বৃত্ত যথাযথভাবে ভরাট না করার কারণেও অনেক শিক্ষাথীর ফল পাল্টে গেছে। কিন্তু এই দায় নিতে নারাজ কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাইরে তাদের করার কিছু ছিল না বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ।

এবছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে গ্রেড পয়েন্টের সাথে প্রাপ্ত নাম্বার চলে আসায় পূর্ণাঙ্গ ফলাফল দেখে অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষাবোর্ডের নির্দয়তার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ করে কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদা আক্তার বলেন, এ বছর কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। কিন্তু ৩ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ২জন ফেল করার প্রশ্নই আসে না। অপরজন একটু খারাপ ছিল।  কিন্তু কেন এমন হলো বুঝলাম না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের এসএসসির ফল প্রকাশের পর অন্তত ১২ হাজার পরীক্ষার্থী তাদের খাতা পুন নিরীক্ষণের আবেদন করেছিল্। তাদের মধ্যে ৩ শ ৬৫ জনের ফল পাল্টে দিয়া হয়েছিল। ১৭ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। বাকিদের ফল আগেও চেয়ে ভালো হয়েছিল।

পুন নিরীক্ষণের পর পরীক্ষার্থীরা যথাযথ ফল পাওয়ায় ভালো ফল করলেও পূর্বে প্রাপ্য ফল না দেয়ায় কোন পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, ফল বিভ্রাটের জন্য মূলত: পরীক্ষকরা দায়ী। এ জন্য আমরা ব্যবস্থাও নিয়েছি। কাউকে আর খাতা দেখতে দেয়া হয় নি। কাউকে পারিশ্রমিক দেয়া হয় নি। বা কেটে নেয়া হয়েছে। আরো কঠোর ব্যবস্থা নিলেতো পরীক্ষক পাবো না।

গত ৪ মে প্রকাশিত কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পাশ ছিল মাত্র ৫৯ দশমিক ০৩ শতাংশ । এর আগের বছর যেখানে পাশের হার ছিলো ৮৪ শতাংশ। ফলাফল এক ধাক্কায়  এতো নিচে নেমে আসার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মাত্র দু’টি বিষয়ের ব্যর্থতা। রেকর্ডকৃত শিক্ষার্থীদের ডুবিয়েছে ইংরেজি ও সাধারণ গণিতের ফলাফল। যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে সার্বিক পাসের হারে। ফল প্রকাশের পর গত দুই দিনে শহরের কম্পিউটার দোকান গুলোতে অকৃতকার্য পরীক্ষাথীরা হুমড়ি খেয়ে খাতা পুন নিরীক্ষণের আবেদন জমা দিচ্ছে অনলাইনে। দুই দিনে কয়েক হাজার আবেদন জমা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে এ বছর কেবল গণিতেই ফেল করেছে ৩৪ হাজার ৬শ ৮৯জন। আর ইংরেজি বিষয়ে উৎরাতে পারেনি ২৫ সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থী। কুমিল্লা বোর্ডে যেখানে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ৭৪ হাজার ৮৬৮ জন সেখানে গণিত ও ইংরেজিতেই ফেল করেছে ৬০ হাজার ২৯৫ জন। এছাড়াও বাংলায় ফেল করেছে প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী। মূলত এ তিন বিষয়ের অকৃতকার্যতাই ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে কুমিল্লা বোর্ডের সার্বিক ফলাফলে। আর এসব বিষয়ে ১ থেকে ৩ নম্বরের জন্য ফেল করেছে সবচেয়ে বেশি।

ভয়াবহ ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো পরীার উত্তরপত্র ত্রুটিমুক্তভাবে মূল্যায়ন। এ কারণটিকেও এবারের এসএসসি পরীার পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবমূল্যায়ন ও অতিমূল্যায়ন রোধে বোর্ড বেশকিছু পদপে গ্রহণ করেছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রধান পরীকদের উত্তরমালা প্রণয়নের জন্য বিশেষ প্রশিণ প্রদান করা। প্রণীত নমুনা উত্তরমালার আলোকে উত্তরমালা মূল্যায়নে অন্যান্য পরীকগণকেও মন্ত্রণালয়ের প থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিণ ও নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তবে উল্লেখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও বেশকিছু উত্তরপত্র একাধিক পরীক দিয়ে মূল্যায়ন ও পূনঃমূল্যায়ন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শহিদুল ইসলাম বলেন, এবছর ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফলাফল করেছে। ফলে এর প্রভাব মূল পাশের হারে গিয়ে পড়েছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, সহায়ক নম্বর প্রদানের বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের কোন দোষ নেই। বোর্ড প্রশ্ন করে না, খাতাও কাটে না। বোর্ড শুধু মন্ত্রনালয়ের নিদের্শনা অনুযায়ী কাজ করে।
তিনি আরো বলেন, কোন বোর্ডই অসীম ক্ষমতার অধিকারী নয়। বোর্ড রাষ্ট্রের একটা প্রতিষ্ঠান। বোর্ডকে সরাসরি তদারকি করে শিক্ষা মন্ত্রনালয়। শিক্ষা মন্ত্রনালয় যে নিয়ম দেবে তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। পরীক্ষার খাতা কাটার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের ফেয়ার জার্জমেন্ট করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফেয়ার জার্জমেন্ট মানে যে যা পাবে তাই দেয়া হবে। এক নম্বরও বেশী দেয়ার কোন নির্দেশনা মন্ত্রনালয় থেকে ছিল না। নিয়মের বাইরে গিয়ে আমরা যদি ১ নম্বরও সহায়ক হিসেবে দিতাম তাহলে আমাদের মন্ত্রনালয়ের কাছে জবাবদিহি করতে হতো।

কায়সার আহমেদ বলেন, এইচএসসির মত এসএসসিতে ১ম পত্র ও ২য়পত্র একসাথে পাশ বিষয়ক কোন বিষয় না থাকায় কো-অরডিনেশান নম্বর দিয়ে পাশ করার কোন সুযোগ নাই। প্রোগ্রামের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ আমাদের নাই। আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারি না এজন্য বোর্ডকে নির্দয় বলেন অথবা ভাল বলেন বোর্ডের গায়ে লাগবে না। মন্ত্রনালয় যদি আমাদের বলে ৩২ পেলে এক নম্বর দিয়ে ৩৩ করে দাও। আমরা করবো।

কম্পিউটারের ভুল হতে পারে কিনা এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের সিস্টেমেটিক কোন ভুল নেই। যিনি কম্পিউটারের কাজ করেন তিনি বারবার মনিটরিং করেন। কারণ ভুল হলে কন্ট্রোলার হিসেবে আমাকেই জবাবদিহি করতে হবে। কম্পিউটার যদি কোন ভুল করে থাকে আমরা পুন:নিরীক্ষণ করলে ভুলটা বেরিয়ে আসবে।

পাশের হার কমার বিষয়ে তিনি বলেন, পাশের হার ৩০ পারসেন্ট নামলে কন্ট্রোলার বা চেয়ারম্যানের কোন লাভ নেই। কুমিল্লা বোর্ড ভাল করুক এটা আমরাও প্রত্যাশা করি।

পলিটিক্যাল নেতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, টেস্টে পাশ না করলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের ফাইনাল পরীক্ষার জন্য অনুমতি দিয়ে দেয়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করে। শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব না থাকলেও গ্রামে এর প্রভাব খুব বেশী। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমার অনুরোধ যেসকল শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না তাদের বিষয়ে আপনারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য বসাবেন না। এক বিষয়ে যারা অকৃতকার্য হবে তাদেরকে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ তারা হয়তো এক থেকে দেড় মাস সেই বিষয়ে অনুশীলন করলে পাশ করে ফেলবে। কিন্তু যারা ২-৩ বিষয়ে ফেল করেছে তাদের বিষয়ে অনুরোধ করবেন না।

আপনার মতামত জানান ...

comments

Leave a Reply