৩৬তম বিসিএস প্রিলিতে চান্স পাওয়ার কৌশল

আর কদিন পরেই ৩৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এ পরীক্ষায় সাফল্যের কলাকৌশল জানাতে এবার পরামর্শ দিয়েছেন ৩৪তম বিসিএস (শিক্ষা) প্রথম স্থান অধিকারী মেধাবী শিক্ষার্থী মৌসুমী ভট্টাচার্য।

শুধু বিসিএস নয় যে কোনো পরীক্ষার আগেই আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিসিএস যেহেতু বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা তাই এর প্রস্তুতিও হওয়া চাই একটু আলাদা। আসলে কর্তৃপক্ষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার মানসিক, শারীরিক ও জ্ঞানগত দিক থেকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকে নির্বাচন করতে চায়। মানসিক দিক দিয়ে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেকে মানানসই করতে পারা বিসিএস কর্মকর্তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং জ্ঞান জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার বিচরণ করার ক্ষমতা থাকতে হয়। এর অর্থ এই নয় যে, তাকে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হবে। বরং সব ক্ষেত্রে আপনাকে প্রাথমিক ধারণা রাখতে হবে। যে কোনো একটি বিসিএস পরীক্ষার ক্ষেত্রে আনুপাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে কমপক্ষে ৬০-৭০ জনের মধ্যে মাত্র একজন পরীক্ষার্থী বিসিএস উর্ত্তীণ হয়ে কর্মে যোগদান করতে পারে।

কখন প্রস্তুতি নেবেন : এ ব্যাপারে বিভিন্ন জনে বিভিন্ন মত প্রকাশ করলেও আমার দৃষ্টিতে এইচএসসি পাস করার পরই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়া দরকার। এতে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ার পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি এগুতে থাকে। যদিও আমি নিজে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম অনার্স চতুর্থ বর্ষ থেকে। কারণ আমার বেসিক খুব ভালো ছিল। আমি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছিলাম। মনে রাখতে হবে, আপনার প্রতিটি ক্লাস, হলে অবস্থান, শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নিয়মিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সবকিছুই বিসিএসে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার কাজের প্রতি গুরুত্ব বাড়বে। ফলে বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া সহজ হবে।

দৈনন্দিন যে কাজগুলো করতে হবে : দৈনন্দিন আপনাকে রুটিন মাফিক ৮-১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হবে। আর বেশি পত্রপত্রিকা ও সব বিষয়ের মূল বই মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে। পত্রপত্রিকা যতটুকু পড়বেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এমন তথ্যগুলো আপনার ডায়রিতে লিখে রাখেন এবং বারবার আত্মস্থ করুন। অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। সব সময় সঙ্গে একটি নোটখাতা ও কলম রাখলে ভালো হয়। মোট কথা আপনাকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে।

বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা : বিসিএসের ক্ষেত্রে সব বিষয়ের রয়েছে সমান গুরুত্ব। প্রথমে আসা যাক সাধারণজ্ঞান, এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে পত্র-পত্রিকার বিকল্প নেই। আপনাকে দৈনন্দিন যে কোনো একটি জাতীয় পত্রিকার চারটি পাতা মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এমন তথ্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে নোট করতে হবে। চারটি পাতার মধ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক, শিল্প ও বাণিজ্য এবং বিজ্ঞানপাতা।

আর কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও বিশ্বের মানচিত্র তো থাকছেই। আর যত বেশি সম্ভব ইতিহাস পড়তে হবে। এরপর বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞানপাঠ্য বই ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন ম্যাগাজিন বেশি উপযোগী। আর ইংরেজির ক্ষেত্রে আপনাকে বেশি বেশি ভোকাভোলারি আয়ত্ত করতে হবে। মোট কথা ভোকাভোলারির বিকল্প নেই। আর সঙ্গে সঙ্গে এসএসসি ও এইসএসসি সিলেবাসের ইংরেজি বইগুলো ভালো করে অধ্যয়ন করা উচিত।

বাংলার ক্ষেত্রে আপনাকে নাম করা কবি, সাহিত্যকদের জীবনী ও তাদের রচনাগুলোর ইতিবৃত্ত বারবার পড়তে হবে। বাংলার জন্য শুধু সিলেবাসের পড়াই যথেষ্ট। সর্বশেষ গণিত ও মানসিক দক্ষতার জন্য আপনাকে অনেক বেশি মনোযোগী হতে হবে। গণিতের জন্য আপনি অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর গণিত বইটি ভালো করে শিখতে হবে এবং বারবার করতে হবে। নতুন নতুন আইটেম শিখতে হবে। আর এতসব পড়ার ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখা উচিত। আর আপনি পরীক্ষার আগে নতুন কোনো বিষয় পড়ার চেষ্টা করবেন না। যেগুলো আগে পড়েছেন সেগুলো বারবার অধ্যয়ন করুন।
সার্বক্ষণিক উপকরণ : শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই ও উপকরণ পরীক্ষা প্রস্তুতির আগ থেকেই আপনার সঙ্গী হতে পারে বা আপনার সংগ্রহে থাকা উচিত। এগুলোর মধ্যে যেমন- বাংলাদেশের সংবিধান, ম্যাপের ওপর কিছু বই, নিজের সংগ্রহে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মানচিত্র, অষ্টম থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর পুরো একসেট বই, বাংলা একাডেমি ইংরেজি বাংলা অভিধান এবং যে কোনো একটি বাংলা টু বাংলা অভিধান। ভোকাভোলারিতে পর্যাপ্ত দক্ষতা রাখতে বেশি বেশি বিগত সালের প্রশ্নগুলো চর্চা করতে হবে। এছাড়া প্রতি মাসে প্রকাশিত যে কোনো একটি চাকরির তথ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন আপনাকে রাখতে হবে। যেমন হতে পারে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অথবা কারেন্ট নিউজ। এর সঙ্গে আপনি বহুল তথ্য সমৃদ্ধ একটি বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন দ্বিমিক রাখতে পারেন। কিন্তু ইংরেজি ফ্লাস কার্ড রাখতে অবশ্যই ভুলবেন না।

একজন পরোক্ষ শিক্ষক : পরোক্ষ শিক্ষক বলতে টিউশনি অথবা কোচিং সেন্টারে পড়ানোকে বুঝানো হয়। বিসিএসে চান্স পাওয়ার জন্য একজন পরোক্ষ শিক্ষকের রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা। আর এক্ষেত্রে আপনি অনার্স পড়াকালীন সময়ে অষ্টম অথবা নবম-দশম শ্রেণীর কোনো শিক্ষার্থীকে টিউশনি করাতে পারেন অথবা কোনো কোচিং সেন্টারে সময় দিতে পারেন। বিশেষ করে টিউশনিতে গণিত, ইংরেজি ও বাংলা পড়ালে আপনার জন্য বেশি ভালো হবে। আমি মনে করি, এই টিউশনি বিসিএসে আপনার কাক্সিক্ষত সফলতা বয়ে আনবে।

বিশেষ পরামর্শ : বিসিএস শিক্ষার্থীদের জন্য সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। তার পরেও কিছু বিশেষ পরামর্শ থাকে। আর সেখান থেকেই বলতে চাই, বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে বেসিকের বিকল্প নাই। যার যত বেসিক ভালো সে তত ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারবে। এক্ষেত্রে আপনি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর সব বিষয়ের পাঠ্য বই মনোযোগ সহকারে পড়তে পারলে খুবই ভালো হবে। এরপর বিভিন্ন সংস্থার জরিপ যেমন সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও বিভিন্ন গবেষণাপত্র ইত্যাদি সাধারণ জ্ঞানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার পরীক্ষার হল। আপনার হল যেখানেই হোক না কেন আপসেট হওয়া যাবে না। আর নম্বরপত্র ভরাট করার ক্ষেত্রে প্রথমে যেগুলো ভালো পারেন সেগুলো আগে দিবেন। ৬০ ভাগ সন্দেহ হয় এমন সব প্রশ্ন ভরাট করা যাবে না। কারণ নেগেটিব নম্বর আপনার প্রতাশিত ফলাফলের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। সর্বশেষ আপনাকে নিয়মিত হতে হবে। মনে রাখবেন, ধৈর্য, চেষ্টা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় এই চারটি গুণ আপনার কাঙ্ক্ষিত সফলতার চাবিকাঠি।

মৌসুমী ভট্টাচার্য
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩৪তম বিসিএসে (শিক্ষা) প্রথম স্থান অধিকারী

অন্যরা যা পড়ছেঃ