বিসিএস: পুলিশ ক্যাডার কেন আকর্ষণীয়?

bcs police

দেশের সিভিল সার্ভিসের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হওয়ার প্রতি চাকরি প্রত্যাশীমাত্রই আকর্ষণ বোধ করেন। দেশের মানুষের জন্য অবদান রাখার বিশাল সুযোগও থাকে এ চাকরিতে যোগদানের মাধ্যমে। তা ছাড়া সাধারণত এ পেশাকে সর্বোচ্চ সম্মানের চাকরি বলেই মনে করে থাকে সাধারণ মানুষ।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সিভিল সার্ভিস সর্বোচ্চ মর্যাদার চাকরি। এ ছাড়া নিরাপত্তা, আর্থিক উন্নতি এবং কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য এ পেশাকে আরো বেশি আকর্ষণীর করে তুলেছে। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন চাকরিপ্রত্যাশীদের বিসিএসের প্রতি আরো বেশি মাত্রায় উৎসাহী করে তুলেছে। যার প্রমাণস্বরূপ সর্বশেষ ৩৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় দুই লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন, যা বিসিএস পরীক্ষার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ৩৪তম বিসিএসে দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। ৩৬তম বিসিএসে এ সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বিসিএস পরীক্ষায় মোট ২৮টি ক্যাডারে নিয়োগ প্রদান করা হয়। যদিও এ পরীক্ষার স্বল্পসংখ্যক প্রার্থীকে নন-ক্যাডার পদেও নিয়োগ প্রদান করা হয়। প্রত্যেক নিয়োগ-প্রত্যাশী যেমন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যে আলাদা তেমনি ক্যাডার চয়েসের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

সাধারণত ৪-৫ টি ক্যাডার অধিক সংখ্যক প্রার্থীর কাছে আকর্ষণীয়। এ তালিকায় পুলিশ ক্যাডার নিঃসন্দেহে প্রথম সারির। বিসিএসে আবেদন করা চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুলিশ ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবেও দিয়ে থাকে। অনেকে আবার এই পেশাকে প্যাশন হিসেবেও নিয়ে থাকে, যাঁরা স্বপ্ন দেখেন সমাজের অন্যায়কে প্রতিহত করার জন্য নিজেকে পুলিশ হতে হবে। উপমহাদেশে পুলিশি ব্যবস্থা প্রথম বাস্তবায়ন করা হয় মোঘল আমলে। তারপর থেকে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলেও আমাদের দেশে পুলিশি ব্যবস্থা ছিল। শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আমাদের বাংলাদেশ পুলিশ। বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে প্রথম হামলা হয়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। প্রতিরোধের শুরুও রাজারবাগ থেকেই যখন বাঙালি পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগার লুট করে থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছিল।

এই লেখায় পুলিশ ক্যাডার হয়ে একজন চাকরিজীবী কী ধরনের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয়ে থাকে তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছি। পুলিশ ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা যেসব বিশেষ এবং আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত হন তা হলো:

১. বৈচিত্র্যময় প্রশিক্ষণ

পুলিশের প্রশিক্ষণ নানান রকমের আছে। এ সুযোগ আবার দেশে ও বিদেশে পাওয়া যায়। চাকরির শুরুতেই একজন পুলিশ ক্যাডারকে এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ করতে হয় রাজশাহীর সারদায়, যা উপমহাদেশের প্রাচীনতম পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এ প্রশিক্ষণ বিভিন্ন অংশে বিভক্ত।

যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, ঘোড়া চালনা, ড্রাইভিং, ডিফেন্সিভ টেক্টিকস (মার্শাল আর্ট, কারাতে, ইত্যাদি), শারীরিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ চলাকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মাস্টার্স করা বাধ্যতামূলক। বেসিক ট্রেনিংয়ের পর বিপিএটিসিতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ করতে হয় প্রত্যেক ক্যাডারকে। এ ছাড়া চাকরিজীবনের নানা পর্যায়ে দেশে-বিদেশে নানান প্রশিক্ষণের সুযোগ তো থাকছেই।

২.  কাজের বৈচিত্র্য

পুলিশিং কোনো সময় নির্দিষ্ট চাকরি নয়। একজন পুলিশ অফিসার দিনের ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহের ৭ দিনই পুলিশ অফিসার। একই সাথে, দালিলিক কাজের চাইতে বাস্তবিক জীবনের সামাজিক নানা সমস্যার সমাধান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ পুরোটাই বৈচিত্র্যপূর্ণ।

যাঁরা কাজের বৈচিত্র্যকে পছন্দ করেন তাঁদের জন্য পুলিশিং উপযুক্ত পেশা। একই সাথে এ পেশাকে আমি চ্যালেঞ্জিংও বলব। সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এ পেশার একজন কর্মজীবী সেবা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া পুলিশে অনেক ইউনিট রয়েছে। পুলিশের ইউনিট ভেদে কাজের ধরনও আলাদা। উল্লেখযোগ্য ইউনিটগুলো হলো : রেঞ্জ পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), সোয়াট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ট্যুরিস্ট পুলিশ ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে এসএসএফে কাজ করার সুযোগ, যারা ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।

৩. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজের সুযোগ

বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করছে। এরই মধ্যে পুলিশের নারী সদস্যরাও মিশনে গেছেন। আফ্রিকা-এশিয়ার, এমনকি আমেরিকার দারিদ্র্যপীড়িত আর দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া ইন্টারপোলের সদস্য হিসেবে অন্য সদস্য দেশের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক বজার রেখে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।

৪. উচ্চশিক্ষার সুযোগ

আগেই বলেছি মৌলিক প্রশিক্ষণের সময়ই একজন পুলিশ ক্যাডার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মাস্টার্স প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া চাকরিজীবনের নানান পর্যায়ে বিভিন্ন বিদেশি সরকার ও সংস্থার অর্থায়নে পুলিশ সদস্যরা মাস্টার্স বা পিএইচডি প্রোগ্রামে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। এ ছাড়া ব্যাক্তিগত উদ্যোগেও দেশি-বিদেশি নানান বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ালেখা করছেন কেউ কেউ।

৫. বিভিন্ন ভাষা শেখার সুযোগ

মিশনে কাজ করার কারণে পুলিশের অনেক সদস্যই ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখে থাকেন। এ ছাড়া ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন অনেকেই। জাতিসংঘের মিশনে যাঁরা যেতে চান তাঁদের ইংরেজির দক্ষতা যাচাই করা হয়। এ ছাড়া যে দেশে একজন পুলিশ সদস্য অবস্থান করেন জাতিসংঘে কাজ করার সুবাদে, সে দেশের ভাষাও কিছুটা শেখা হয়ে যায়।

৬. লজিস্টিক সাপোর্ট

কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনেই একজন পুলিশ ক্যাডার চাকরি জীবনের শুরু থেকেই সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তা ছাড়া বিশেষ বাহিনী হিসেবে র‍্যাবে কাজ করার সুবাদে বেতনের অতিরিক্ত ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ভাতা সুবিধা অন্য দুয়েকটি ইউনিটেও আছে। তা ছাড়া এই চাকরিতে যেহেতু ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক, তাই ইউনিফর্মের জন্যও পুলিশ সদস্যরা ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনাতে অগ্রাধিকার ও বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন পুলিশ ক্যাডারের অফিসাররা।

৭. অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান   

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্য সব ক্যাডারের মতই বেতন পেয়ে থাকেন পুলিশ ক্যাডাররা। কিন্তু জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজের সুবাদে পুলিশ সদস্যরা অর্থনৈতিক ভাবে বেশ লাভবান হয়ে থাকেন। এ ছাড়া সামাজিকভাবে পুলিশ ক্যাডার নিরাপদ অবস্থানেই থাকেন।

এবার আসি পুলিশ ক্যাডার হতে চাইলে আপনার কী যোগ্যতা প্রয়োজন সে প্রসঙ্গে। বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার যোগ্য যে কেউ পুলিশ চয়েস দিতে পারেন পুলিশ ক্যাডার হতে চাইলে। এর সাথে উচ্চতা থাকতে হবে পুরুষদের বেলায় ৫’৪” আর নারীদের বেলায় ৫’২”। চোখের দৃষ্টি হতে হবে ৬/৬।

এর সাথে মানসিকভাবে পুলিশ ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছা। যদি কেউ পুলিশ ক্যাডার হতে চান তবে বিসিএস পরীক্ষাতে ভালো নম্বর তুলতে হবে বলেই ধারণা করা হয়। কারণ, এ ক্যাডার অনেকেরই পছন্দের শীর্ষে থাকে। তাই যার নম্বর বেশি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তারাই পছন্দের ক্যাডার পেয়ে থাকেন।

তবে আশার কথা হচ্ছে, বিগত কয়েকটি বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পূর্ববর্তী ব্যাচগুলোর থেকে বাড়ানো হয়েছে। তাই, পুলিশ ক্যাডার হতে চাইলে চয়েসে তা প্রথম দিকে দিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করুন। সবার জন্য শুভকামনা রইলো।

লেখক : এএসপি (প্রবেশনার), ৩৩ তম বিসিএস।